আয়কর নির্দেশিকা ২০২৫-২০২৬

২০২৫-২০২৬ কর বছরে বাংলাদেশে আয়কর রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এখন অধিকাংশ ব্যক্তি শ্রেণীর করদাতার জন্য অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে। আপনি যদি একজন চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী বা সাধারণ করদাতা হন, তবে এই নির্দেশিকাটি আপনাকে সঠিক সময়ে এবং সঠিক নিয়মে আয়কর পরিপালনে সাহায্য করবে।

আয়কর রিটার্ন ২০২৫-২০২৬: একনজরে মূল তথ্য

সহজে বোঝার জন্য নিচে ২০২৫-২০২৬ কর বছরের প্রধান বিষয়গুলো দেওয়া হলো:

  • অনলাইন রিটার্ন: সকল স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
  • রিটার্ন দাখিলের শেষ তারিখ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫ (ট্যাক্স ডে)।
  • করমুক্ত আয়ের সাধারণ সীমা: বছরে ৩,৫০,০০০ টাকা।
  • অফিসিয়াল পোর্টাল: etaxnbr.gov.bd

কাদের জন্য আয়কর রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক?

আয়কর নির্দেশিকা ২০২৫-২০২৬ অনুযায়ী, দুই ধরনের ব্যক্তি করদাতাকে রিটার্ন দাখিল করতে হবে:

ক) আয়ের ভিত্তিতে:

  • সাধারণ পুরুষ করদাতা: আয় বছরে ৩,৫০,০০০ টাকার বেশি হলে।
  • নারী এবং ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব করদাতা: আয় ৪,০০,০০০ টাকার বেশি হলে।
  • তৃতীয় লিঙ্গ এবং প্রতিবন্ধী করদাতা: আয় ৪,৭৫,০০০ টাকার বেশি হলে।
  • গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা: আয় ৫,০০,০০০ টাকার বেশি হলে।

খ) অন্যান্য শর্তে (আবশ্যিকভাবে):

আপনার আয় করযোগ্য না হলেও কিছু ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক, যেমন: ২০ লক্ষ টাকার বেশি ঋণ নিলে, আমদানিকারক বা রপ্তানিকারক হিসেবে নিবন্ধিত থাকলে, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে চাইলে বা সঞ্চয়পত্র কিনতে চাইলে (১০ লক্ষ টাকার বেশি)।

২০২৫-২০২৬ কর বছরের আয়কর হার

বর্তমান অর্থবছরে আয়ের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত কর হারগুলো নিচে দেওয়া হলো:

মোট আয়ের স্তরকরের হার
প্রথম ৩,৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত০% (শূন্য)
পরবর্তী ১,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত৫%
পরবর্তী ৪,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত১০%
পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত১৫%
পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত২০%
পরবর্তী ২০,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত২৫%
অবশিষ্ট মোট আয়ের ওপর৩০%

অনলাইনে রিটার্ন (e-Return) জমা দেওয়ার নিয়ম

সরকার ই-রিটার্ন ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় ও সহজ করতে এটি বাধ্যতামূলক করেছে। অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি নিচে দেওয়া হলো:

  1. রেজিস্ট্রেশন: প্রথমে etaxnbr.gov.bd পোর্টালে গিয়ে আপনার ই-টিআইএন (e-TIN) এবং বায়োমেট্রিক ভেরিফাইড মোবাইল নম্বর দিয়ে অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন।
  2. লগইন: রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হলে আপনার টিআইএন এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন।
  3. তথ্য পূরণ: আয়ের উৎস (চাকরি, ব্যবসা, বাড়ি ভাড়া ইত্যাদি), বিনিয়োগের বিবরণ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সংক্রান্ত তথ্যগুলো নির্দিষ্ট ফর্মে পূরণ করুন।
  4. কর পরিশোধ: যদি কোনো কর প্রদেয় থাকে, তবে তা ‘এ-চালান’ (e-Challan) বা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করুন।
  5. দাখিল: সকল তথ্য যাচাই করে সাবমিট করুন। সফলভাবে সাবমিট হলে একটি ‘অ্যাকনলেজমেন্ট স্লিপ’ (Acknowledgement Slip) ডাউনলোড করে নিন।

কীভাবে কর সাশ্রয় করবেন?

নির্দিষ্ট কিছু খাতে বিনিয়োগ করলে আপনি কর রেয়াত বা ছাড় পেতে পারেন। উল্লেখযোগ্য খাতগুলো হলো:

  • জীবন বিমার প্রিমিয়াম পরিশোধ।
  • ডিপিএস (DPS) বিনিয়োগ (বছরে সর্বোচ্চ ১,২০,০০০ টাকা)।
  • সঞ্চয়পত্র ক্রয় (সর্বোচ্চ ৫,০০,০০০ টাকা)।
  • তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার বা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ।
  • সরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ডে চাঁদা।

রেয়াতের পরিমাণ নির্ধারণ: মোট আয়ের ৩% অথবা প্রকৃত বিনিয়োগের ১৫% অথবা ১০ লক্ষ টাকা— এই তিনটির মধ্যে যেটি কম, সেই পরিমাণ অর্থ আপনি কর রেয়াত হিসেবে পাবেন।

প্রয়োজনীয় নথিপত্র (চেকলিস্ট)

রিটার্ন পূরণের সময় নিচের নথিগুলো সাথে রাখুন:

  • বেতন বিবরণী (Salary Certificate)।
  • ব্যাংক স্টেটমেন্ট (সুদ আয়ের বিবরণসহ)।
  • বিনিয়োগের প্রমাণ (ডিপিএস বা বিমার রশিদ)।
  • বাড়ি ভাড়ার চুক্তিনামা বা রসিদ।
  • সম্পদ ও দায়ের বিবরণী (৫০ লক্ষ টাকার বেশি সম্পদ থাকলে বাধ্যতামূলক)।

সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর

প্রশ্ন ১: আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ সময় কবে?

উত্তর: ২০২৫-২০২৬ কর বছরের জন্য সাধারণ করদাতাদের রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ হলো ৩১ জানুয়ারী ২০২৬।

প্রশ্ন ২: অনলাইনে রিটার্ন দেওয়া কি সবার জন্য বাধ্যতামূলক?

উত্তর: হ্যাঁ, অধিকাংশ করদাতার জন্য এটি বাধ্যতামূলক। তবে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী, প্রতিবন্ধী, প্রবাসী বাংলাদেশী এবং মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের ক্ষেত্রে এই বাধ্যতামূলক শর্তটি শিথিলযোগ্য (তারা চাইলে ম্যানুয়ালি দিতে পারেন)।

প্রশ্ন ৩: রিটার্ন জমা না দিলে কী হবে?

উত্তর: নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা না দিলে আয়কর আইন অনুযায়ী জরিমানা, অতিরিক্ত সরল সুদ এবং কর অব্যাহতির সুবিধা বাতিলের মতো আইনি ব্যবস্থার সম্মুখীন হতে পারেন।

শেষকথা:

সঠিক সময়ে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা শুধুমাত্র একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি একজন সুনাগরিকের দায়িত্ব। অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে এখন ট্যাক্স রিটার্ন দেওয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছ ও সহজ। আপনার আয় এবং বিনিয়োগের সঠিক তথ্য দিয়ে সময়মতো রিটার্ন জমা দিন এবং অপ্রয়োজনীয় জরিমানা থেকে মুক্ত থাকুন।

সূত্র: আয়কর নির্দেশিকা ২০২৫-২০২৬, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR), বাংলাদেশ।

Leave a Comment