সরকারি কর্মচারী ও নাগরিকদের জন্য বিধি, অফিস আদেশ, পে-স্কেল, পেনশন ও চাকরিসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য

BD Service Rules

আপনার প্রশ্নের উত্তর খুঁজুন, সহজভাবে

চাকরির বিধি, বেতন-ভাতা, পে-ফিক্সেশন ও সরকারি সেবার প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজুন।

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের ১ম উচ্চতর গ্রেড ও অর্থ বিভাগের ৬০ নম্বর স্মারক: ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০ ব্যাচ কেন ২০২৮ সালের পূর্বে প্রাপ্য নয়?

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের প্রথম উচ্চতর গ্রেড (1st Higher Grade) প্রাপ্যতা এবং চাকরিকাল গণনা নিয়ে মাঠ পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা ও বিভ্রান্তি দেখা যায়। বিশেষ করে ২০০৮, ২০০৯ এবং ২০১০ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের প্রথম উচ্চতর গ্রেড কবে প্রাপ্য হবে—তা নিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিস ও হিসাবরক্ষণ অফিসগুলোতে প্রায়ই প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।

সরকারি বিধি ও অডিট নির্দেশনা অনুযায়ী মূল সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট: সহকারী শিক্ষকদের ০৯/০৩/২০১৪ তারিখে বেতন স্কেল উন্নীত করা হয় এবং ২০২০ সালে (০৯/০২/২০২০ তারিখে) পুনরায় বেতন স্কেল উন্নীত করা হয়। এজন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যেসব সহকারী শিক্ষকের নিয়োগ ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০ সালে এবং যাঁরা ০৯/০৩/২০১৪ তারিখের পূর্বে প্রথম টাইমস্কেল পাননি, তাঁরা ২০২৮ সালের পূর্বে প্রথম উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য নন। উল্লেখ্য, এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের ৬০ নম্বর স্মারক এখনো সম্পূর্ণ বলবৎ রয়েছে। নিচে এর পেছনের দালিলিক নিয়ম, স্মারক ও গাণিতিক হিসাব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

একনজরে মূল দালিলিক তথ্য ও সরকারি সিদ্ধান্ত

  • ১ম দফা বেতন স্কেল উন্নীতকরণ (০৯/০৩/২০১৪): সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল ০৯/০৩/২০১৪ তারিখে এক ধাপ উন্নীত করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের ১৪তম গ্রেড এবং প্রশিক্ষণবিহীনদের ১৫তম গ্রেড নির্ধারণ করা হয়।
  • ২য় দফা বেতন স্কেল উন্নীতকরণ (০৯/০২/২০২০): পরবর্তীতে ২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল পুনরায় উন্নীত করে সরাসরি ১৩তম গ্রেডে উন্নীত করা হয়।
  • অর্থ বিভাগের ৬০ নম্বর স্মারক বলবৎ থাকা: অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগের স্মারক নং- ০৭.০০.০০০০.১৬৫.০৭.০০২.১২.৬০ (তারিখ: ০৯/০৮/২০২১) এখনো বাতিল বা রহিত হয়নি; এটি অদ্যাবধি পূর্ণাঙ্গভাবে বলবৎ রয়েছে।
  • ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০ ব্যাচের প্রাপ্যতা: যেহেতু এই তিন ব্যাচের শিক্ষকরা ০৯/০৩/২০১৪ তারিখের পূর্বে ৮ বছর চাকরিকাল পূর্ণ না হওয়ায় প্রথম টাইমস্কেল পাননি এবং পরবর্তীতে দুই দফায় (২০১৪ ও ২০২০ সালে) উন্নীত বেতন স্কেল পেয়েছেন, তাই বলবৎ থাকা বিধিমোতাবেক তাঁরা ২০২৮ সালের পূর্বে প্রথম উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হবেন না।

১. সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল উন্নীতকরণের প্রেক্ষাপট (২০১৪ ও ২০২০)

বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে হলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড পরিবর্তনের ধারাবাহিক ইতিহাসটি দেখা প্রয়োজন:

  1. ০৯/০৩/২০১৪ তারিখের পূর্বে অবস্থান: জাতীয় বেতনস্কেল, ২০০৯ অনুযায়ী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা ১৫তম গ্রেডে এবং প্রশিক্ষণবিহীন সহকারী শিক্ষকরা ১৬তম গ্রেডে বেতন পেতেন। তৎকালীন বিধিমোতাবেক চাকরির ৮ বছর, ১২ বছর ও ১৫ বছর পূর্তিতে যথাক্রমে ১ম, ২য় ও ৩য় টাইমস্কেল প্রাপ্য হতেন।
  2. ০৯/০৩/২০১৪ তারিখে বেতন স্কেল উন্নীতকরণ: সরকার প্রাথমিক শিক্ষকদের মানোন্নয়নের অংশ হিসেবে ০৯/০৩/২০১৪ তারিখ হতে সহকারী শিক্ষকদের পদের বেতন স্কেল উন্নীত করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের ১৪তম গ্রেড এবং প্রশিক্ষণবিহীনদের ১৫তম গ্রেড প্রদান করে।
  3. জাতীয় বেতনস্কেল ২০১৫ ও টাইমস্কেল বিলুপ্তি: ৩০/০৬/২০১৫ তারিখের পর টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড প্রথা চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। পরিবর্তে চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫-এর অনুচ্ছেদ ৭(১) অনুযায়ী একই পদে ও একই স্কেলে পদোন্নতি ব্যতিরেকে ১০ বছর ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার নিয়ম চালু হয়।
  4. ২০২০ সালে পুনরায় বেতন স্কেল উন্নীতকরণ: ০৯/০২/২০২০ তারিখে সরকার পুনরায় সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল উন্নীত করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও প্রশিক্ষণবিহীন নির্বিশেষে সবাইকে ১৩তম গ্রেড প্রদান করে।

২. ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০ সালে নিয়োগপ্রাপ্তরা কেন ০৯/০৩/২০১৪-এর পূর্বে ১ম টাইমস্কেল পাননি?

পূর্বে প্রচলিত টাইমস্কেল বিধি অনুযায়ী, প্রথম টাইমস্কেল পাওয়ার শর্ত ছিল একই পদে ন্যূনতম ৮ বছর সন্তোষজনক চাকরি পূর্ণ হওয়া। এখন নিয়োগের সাল অনুযায়ী হিসাব করলে দেখা যায়:

নিয়োগের সাল (ব্যাচ)৮ বছর পূর্ণ হওয়ার বছর০৯/০৩/২০১৪ তারিখে চাকরিকাল০৯/০৩/২০১৪-এর পূর্বে ১ম টাইমস্কেল প্রাপ্যতা
২০০৫ ও ২০০৬ সালের শুরুতে নিয়োগপ্রাপ্ত২০১৩ ও ২০১৪ সালের মার্চের পূর্বে৮ বছর পূর্ণহ্যাঁ (০৯/০৩/২০১৪-এর পূর্বেই ১ম টাইমস্কেল প্রাপ্ত)
২০০৮ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত২০১৬ সালপ্রায় ৫–৬ বছরপাননি (৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ২০১৪ সালে স্কেল উন্নীত ও ২০১৫-তে টাইমস্কেল বিলুপ্ত)
২০০৯ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত২০১৭ সালপ্রায় ৪–৫ বছরপাননি
২০১০ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত২০১৮ সালপ্রায় ৩–৪ বছরপাননি

অর্থাৎ ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০ সালে যোগদানকৃত সহকারী শিক্ষকদের চাকরির বয়স ০৯/০৩/২০১৪ তারিখে ৮ বছর পূর্ণ না হওয়ায় তাঁরা ওই তারিখের পূর্বে প্রথম টাইমস্কেল প্রাপ্য হননি।

৩. অর্থ বিভাগের ৬০ নম্বর স্মারক এবং কেন ২০২৮ সালের পূর্বে ১ম উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য নয়?

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগ (বাস্তবায়ন-৫ শাখা) থেকে ০৯/০৮/২০২১ তারিখে জারিকৃত স্মারক নং- ০৭.০০.০০০০.১৬৫.০৭.০০২.১২.৬০ (যা সংক্ষেপে ‘অর্থ বিভাগের ৬০ নম্বর স্মারক’ হিসেবে পরিচিত) প্রাথমিক শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। এখন পর্যন্ত অর্থ বিভাগের এই ৬০ নম্বর স্মারকটি সম্পূর্ণ বলবৎ রয়েছে।

৬০ নম্বর স্মারক ও সংশ্লিষ্ট বিধির মূল নির্দেশনা হলো:

  • যাঁরা ০৯/০৩/২০১৪ তারিখের পূর্বে প্রথম টাইমস্কেল পাননি (যেমন ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০ ব্যাচের সহকারী শিক্ষকগণ), তাঁদের ক্ষেত্রে যোগদানের মূল তারিখ থেকে ১০ বছর হিসাব করে প্রথম উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য হবে না।
  • কারণ তাঁদের পদের মূল বেতন স্কেল প্রথমে ০৯/০৩/২০১৪ তারিখে উন্নীত করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে ২০২০ সালে পুনরায় ১৩তম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে।
  • অর্থ বিভাগের বলবৎ থাকা বিধি অনুযায়ী, পদের বেতন স্কেল উন্নীতকরণের ফলে পূর্বের নিম্নতর গ্রেডে কাটানো চাকরিকাল পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডের জন্য গণনাযোগ্য থাকে না; বরং স্কেল উন্নীতকরণের তারিখ ও দুই দফা উন্নীত স্কেল প্রাপ্তির শর্ত বিবেচনায় ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত (০৯/০৩/২০১৪-এর পূর্বে টাইমস্কেল না পাওয়া) সহকারী শিক্ষকগণ ২০২৮ সালের পূর্বে প্রথম উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য নন।
  • অন্যদিকে যাঁরা ০৯/০৩/২০১৪ তারিখের পূর্বেই একটি টাইমস্কেল পেয়েছিলেন, তাঁদের দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড গণনার নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন আমাদের অপর প্রতিবেদন: সহকারী ও প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড: স্কেল উন্নীতকরণের তারিখ থেকেই ৬ বছর গণনা।

৪. অডিট আপত্তি (Audit Objection) এড়াতে শিক্ষকদের করণীয় ও সতর্কতা

মাঠ পর্যায়ে অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কোনো উপজেলায় অর্থ বিভাগের ৬০ নম্বর স্মারকের শর্তাবলি যথাযথভাবে যাচাই না করেই যোগদানের তারিখ থেকে ১০ বছর ধরে উচ্চতর গ্রেড মঞ্জুর বা ফিক্সেশন করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে স্থানীয় ও রাজস্ব অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় (Audit Inspection) কিংবা পেনশন/পিআরএল (PRL) মঞ্জুরির সময় হিসাবরক্ষণ অফিসে সার্ভিস বুক ও আইবাস++ (iBAS++) যাচাইকালে এগুলো সরাসরি অডিট আপত্তির (Audit Objection) মুখে পড়ে।

অডিট আপত্তি হলে গৃহীত অতিরিক্ত বেতন-ভাতা (Overpayment) এককালীন চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হয় বা পেনশন গ্র্যাচুইটি থেকে কর্তন করা হয়, যা একজন শিক্ষকের জন্য চরম আর্থিক ও মানসিক ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই:

  1. অর্থ বিভাগ কর্তৃক ৬০ নম্বর স্মারক সংশোধন বা নতুন কোনো স্পষ্টীকরণ প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকা স্মারকের বাইরে গিয়ে বেতন ফিক্সেশন না করাই নিরাপদ।
  2. নিজের সার্ভিস বুক ও আইবাস++ (iBAS++) প্রোফাইলে ০৯/০৩/২০১৪ এবং ০৯/০২/২০২০ তারিখের স্কেল উন্নীতকরণের এন্ট্রি সঠিক আছে কি না তা যাচাই করে রাখুন। (আইবাস++ পে ফিক্সেশন করার সময় ৭টি সতর্কতা দেখুন)।
  3. নতুন পে স্কেল ২০২৬-এ ১৩তম গ্রেডের মূল বেতন ও ধাপগুলো দেখতে পড়ুন: ১৩তম গ্রেডের বেতন ২০২৬: প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকের নতুন বেতন ২৪,০০০ থেকে ৫৮,০০০ টাকা।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকরা কেন ২০২৮ সালের পূর্বে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাবেন না?
উত্তর: কারণ তাঁরা ০৯/০৩/২০১৪ তারিখের পূর্বে প্রথম টাইমস্কেল পাননি এবং পরবর্তীতে ০৯/০৩/২০১৪ তারিখে ও ২০২০ সালে পুনরায় তাঁদের পদের বেতন স্কেল উন্নীত করা হয়েছে। অর্থ বিভাগের বলবৎ থাকা ৬০ নম্বর স্মারক অনুযায়ী স্কেল উন্নীতকরণের কারণে তাঁরা ২০২৮ সালের পূর্বে প্রথম উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্য নন।

প্রশ্ন ২: অর্থ বিভাগের ৬০ নম্বর স্মারক কি এখনো বলবৎ আছে?
উত্তর: হ্যাঁ। অর্থ বিভাগের বাস্তবায়ন অনুবিভাগের ০৯/০৮/২০২১ তারিখের ৬০ নম্বর স্মারক (স্মারক নং: ০৭.০০.০০০০.১৬৫.০৭.০০২.১২.৬০) এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ বলবৎ রয়েছে।

প্রশ্ন ৩: প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল কোন কোন সালে উন্নীত করা হয়েছিল?
উত্তর: প্রথমবার ০৯/০৩/২০১৪ তারিখে (প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের ১৪তম ও প্রশিক্ষণবিহীনদের ১৫তম গ্রেডে) এবং দ্বিতীয়বার ০৯/০২/২০২০ তারিখে (সকল সহকারী শিক্ষককে ১৩তম গ্রেডে) বেতন স্কেল উন্নীত করা হয়।

সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট ও গাইড

1 thought on “প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের ১ম উচ্চতর গ্রেড ও অর্থ বিভাগের ৬০ নম্বর স্মারক: ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০ ব্যাচ কেন ২০২৮ সালের পূর্বে প্রাপ্য নয়?”

Leave a Comment

Share with